এক অদ্ভুত চেয়ার
আজ রাত প্রায় তিনটে বেজে পাঁচ মিনিটে,
ঈশ্বর মরে গেলো,
অনেক বুড়ো হ'য়ে গিয়েছিলো সে;
অনেক বয়সে বেচারা মারা গেলো।
ঈশ্বর-দা বড়ো ভালো লোক ছিলো;
সবার ভালো-মন্দের খবর রাখতো,
সবার কাছে যেতো,
সবার হাত ধরে বসে থাকতো,
সবার বুকের কাছে বসে থাকতো।
ঈশ্বর-দা বড়ো ভালো লোক ছিলো।
আজ, ঈশ্বর-দা মরে গেলো
ঈশ্বর-দা আর আমাদের মধ্যে নেই,
থাকবে না; থাকলো না।
কারো কোর্ট-কাছারি যেতে হবে
ঈশ্বর আছেন সাথে।
কারো ছেলের পরীক্ষায় পাশ করতে হবে
ঈশ্বর আছেন সাথে।
কারো চাকরির প্রমোশন দরকার
ঈশ্বর আছেন সাথে।
কেউ রাত্রে কারো বাড়িতে সিঁদ কেটে ঢুকবে
ঈশ্বর আছেন সাথে।
ঈশ্বর আছেন সাথে।
কেউ কাউকে অবৈধ সংগম করবে
কেউ মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ধুলোয় গড়াগড়ি দেবে
কেউ মে-মানুষের ব্যবসা করে পেট চালাবে
কেউ ব্লাডব্যাংকে ঘোলা রক্ত জমা দেবে
কারো লাশ কবর দেওয়া হবে, মাটি খোঁড়া হচ্ছে;
ঈশ্বর আছেন।
ঈশ্বর সবার সাথে আছেন;
সব জায়গাতেই থাকেন, সবার কাছে যান,
ঈশ্বর মানে আমাদের ঈশ্বর-দা
আমাদের সবার বড় উপকারে লাগতেন।
এখন - এখন কে থাকলো
ঈশ্বর-দা’র মত কে থাকলো আর।
ঈশ্বর-দা তুমি আমাদের বড় ঠকিয়ে দিয়ে চলে গেলে;
ঈশ্বর-দা তোমার মরা উচিত হয়নি;
তোমার আরো-আরো-আরো অনেক দিন বেঁচে থাকা উচিত ছিল।
ঈশ্বর-দা, বুড়ো হলেই কি মরতে হয়
আরো তো বুড়ো হওয়া যায়
আরো তো বুড়ো হতে পারতে
ঈশ্বর-দা, তুমি কেনো এতো তাড়াতাড়ি মরে গেলে।
এখন আমি কি করবো;
আমার একটা প্রমোশন দরকার
আমার একটা প্রমোশন দরকার
আমার একটা প্রমোশন দরকার;
আমি কাকে ডাকব? কার কাছে বলব?
কে আমার বুকের কাছে এসে বসবে?
কে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে?
ঈশ্বর-দা, তুমি কোথায় গেলে আমাদেরকে ছেড়ে।
তবে বড্ড বেশি ঘুরঘুর করতে তুমি আমাদের পিছুপিছু;
আমরা তাই হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।
তোমার এত লক্ষলক্ষ জোড়া চোখ ছিলো
তোমার এত লক্ষলক্ষ হাত ছিলো - যে, আমরা
হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।
আমাদের ভয়ের কারণ হয়েছিলে তুমি
আমরা ভীত সন্ত্রস্ত কাঁপতাম,
মনে-মনে হয়তো চাইতাম, ব্যাটাতো অনেক বুড়ো হলো
মরে না কেন বুড়োহাবড়া।
কিন্তু, এখন ঠকলো কে;
তুমি না আমি।
প্রাথমিক দৃষ্টিতে মনে হবে আমি;
আমরা সবাই ঠকলাম, হারালাম।
কিন্তু একটা বড় লাভ হয়ে গেলো এর মধ্যে,
তোমার মরে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে আমরা;
আমি; আমি স্বাধীন হলাম; আমরা স্বাধীন হলাম;
আমরা স্বাধীন হলাম; আমাদের মাথার ওপর আর কেউ
থাকলো না যে, আমাদের রক্ষা করবে।
আমরা স্বাধীন হলাম,
এখন থেকে আমরা আমাদেরকেই রক্ষা করবো।
আমি আমাকেই বাঁচাবো; আমাকে বেঁচে থাকতেই হবে।
আমি বাঁচবো। তোমাকে ছাড়াই বাঁচবো।
তোমাকে আর আমি কোর্ট-কাছারিতে নিয়ে যাবো না
আঁস্তাকুড়ে নিয়ে যাবো না
কবরস্থানে নিয়ে যাবো না
আমি সব জায়গায় এখন একলা-একলা যাবো।
একলা যাবো। একলা যাবো। আমি স্বাধীন।
তুমি নেই, তাই আমি স্বাধীন।
এ স্বাধীনতার আনন্দ কম নয়,
এ স্বাধীনতার দুঃখ কম নয়,
এ স্বাধীনতার বিষাদ কম নয়,
এ স্বাধীনতার বোঝা কম নয়;
বড় বেশি। বেশি।
তা-ই কি পিঠ কুঁজো হয়ে যাবে; না।
তা কখনো হতে দেবো না।
আমরা পিঠ উঁচু করে থাকবো; আমরা শিরদাঁড়া
গরুর শিং-এর মতো বাঁকিয়ে দেবো না।
আমরা, উঁচু খাড়া মিনার হয়ে থাকবো।
আমরা আমাদেরকে তৈরি করবো।
আমার সৃ’ি আমি করবো, আমিই আমার সৃি’।
এ কি আনন্দ; এ কি সুখ; এ কি জয়;
ভালোই হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে ঈশ্বর-দা তুমি কালকে
মারা গেছো বা আজকে মারা গেছো বা অনেকদিন আগেই
মারা গেছো, তুমি নেই আমাদের মধ্যে, তুমি আর নেই।
আমরা তাই বেঁচে গেলাম।
আমরা তাই অনেক হৃদয়, অনেক হাত, শিরা-উপশিরা, মসি-ষ্ক
সময় ও আকাশ, এই সব পেয়ে গেলাম।
আমরা মানুষের মতো মানুষ হলাম, শেষ পর্যন্ত
একটা পোকা একটা মানুষ হলো - এর চেয়ে বড়
বিস্ময় আর - কি হতে পারে ঈশ্বর;
এর চেয়ে বড় বিস্ময় আর - কি হতে পারে ঈশ্বর-দা।
ধন্যবাদ। তোমাকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ হে বুড়োহাবড়া
ঈশ্বর-দা তোমাকে ধন্যবাদ।
কিন', আমি নিজের জন্যে এক নিদারুণ নির্বাসন সৃষ্টি করে বসেছি,
এ-স্বাধীনতা দিয়ে আমি কি করবো, এ - লোহার স্বাধীনতা।
না, আমার প্রমোশন হতো না
তুমি থাকলেও হতো না, তুমি নেই, তাও হবে না;
আমি এ্যাসিস্ট্যান্ট-টিচার হয়েই রিটায়ার করবো,
তা আমি জানি - আমি কোনোদিন হেডমাস্টার হবো না।
কিন' সমস্যাটা হলো তুমি অন্তত কাছে এসে বসতে,
হাত ধরে কিছুক্ষণ কথা বলতে, সেটা? সেটার কি হবে?
তেমন লোক আর কই পাবো।
হে ঈশ্বর-দা তোমার মতো লোক আর কই পাবো
যে সমস- ব্যর্থতাকে হাসিতে বদলে দিতে পারে,
বদলে দিতো এক সময়;
আজ শুধু লোহা, শুধু সিসে, শুধু দস্তা,
এ স্বাধীনতা নিয়ে কি হবে আমার
যখন এ স্বাধীনতা অর্থহীন; যখন আমি আমার ইচ্ছে মতো
কিছুই করতে পারবো না, তখন এ স্বাধীনতার মানে নেই।
আমি কিছুই করতে পারি না
কিছুই করতে পারবো না
আমি কিছুই করার মত যোগ্যতা অর্জন করে নিতে পারবো না,
কেন-না এ-অধিকার আমার মধ্যে নেই
যে-যা হবার তাই হবে
আমার যা হাবার তাই হবে
এর একটু এদিক-ওদিক হবে না।
বেশতো নাই হতে।
জীবনকে না-হয় দুঃখ বলেই জানতাম
জীবনকে না-হয় ব্যর্থতা বলেই জানতাম;
তবুতো ছিলো একটু মমতা, একটা মমতার হাত,
বুকে একটা নিশ্বাস।
কিছুই থাকলো না
কিছুই-যে থাকলো না।
তাই আমি স্বাধীন, কিন্ত এ স্বাধীনতা মিথ্যে, ঈশ্বর-দা
তুমি নেই বলে এ-স্বাধীনতা কারাগার হয়ে গেলো;
তোমার মৃত্যু এ-স্বাধীনতাকে একটা আজগুবী পাথর বানিয়ে দিলো।
হায় স্বাধীনতা
হায় মানুষের স্বাধীনতা।
আমি এখন তাই রাতে বকুল গাছের গলা জড়িয়ে কাঁদি
শিকড়ের হাড় জড়িয়ে কাঁদি
পাতার শিরদাঁড়া চিবোতে-চিবোতে কেঁদে ফেলি;
বড় তেতো লাগে, সব কিছু বড় তেতো, বড় তেতো।
এখন ভাবছি, আমাকে নিজেকে সৃষ্টি করার সুখ বেশি
না, তোমার মতো একজন ঈশ্বর-দা'কে সৃষ্টি করার আনন্দ বেশি।
মানুষের এই অদ্ভুত তেজারতিতে কোনটা লাভ;
ঠিক, সত্যি কথা তোমার দেওয়া স্বাধীনতা পেয়ে
তোমার দেওয়া স্বাধীনতা, না তুমি নিজে; কোনটা।
প্রায় অনেকেই বেশ বড়লোক হয়েছে,
অনেককে চুম্বক করে দিয়েছে।
কিন' তোমার এই বাজে স্বাধীনতা আমাকে দিয়েছে শুধু হাওয়া,
জল, নুন, ফুসফুসে ছেঁদা, ক্লট-হয়ে-যাওয়া রক্ত,
আমার নাড়িতে তুমি দিয়েছো একটা ঘা; পচা-ঘা;
আর এই ঘা নিয়ে আমাকে বেঁচে থাকতে হয়
কারণ, আত্মহত্যার শক্তি তুমি যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে হরণ করে
নিয়ে গেছো, আমার সমস- বোধ তুমি চুরি করে নিয়ে গেছো,
আমাকে তুমি রিক্ত শূন্য হাহাকার করে গেছো।
তুমি আমার বন্ধু ছিলে অথচ তুমিই সবচে’ শত্রুতা করে গেলে
আমার সাথে। পৃথিবীর অন্যকোনো মানুষ সম্পর্কে আমার কোনো
মাথাব্যথা নেই। তুমি তাদেরকে দিয়ে গেছো রাজনীতি ও অর্থনীতি
নামক দুটো দু’ জন'। তারা ভালো আছে। ভালো থাকবে।
আর আমার বন্ধুত্বের প্রতিদানে দিয়ে গেছো একলা ঘরে চুপচাপ
বসে-থাকা। আকাশ দেখা। সূর্য দেখা। মানুষের হৈচৈ
চিৎকার ক্ষুধা লাশ যুদ্ধ মড়ক দেখা। আমাকে দিয়ে গেছো শুধু
চুপচাপ বসে-থাকা, এ-চেয়ারে। এই চেয়ারে। তোমার দান
শুধু একটা চেয়ার। শুধু একটা চেয়ার।
এখন আব্বা আমার কাছে ভালোবাসা চায়
আম্মা আমার কাছে ভালোবাসা চায়
বৌ আমার কাছে ভালোবাসা চায়
টুটুল আমার কাছে ভালোবাসা চায়
শম্পা আমার কাছে ভালোবাসা চায়
এতো ভালোবাসা আমি কোথায় পাবো।
তুমি মরে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে আমার সমস- ভালোবাসার ক্ষমতাও
চলে গেছে। আমি আর ভালোবাসতে পারি না। কিছুই ভালোবাসতে
পারি না। কাউকে ভালবাসতে পারি না। ভালোবাসা নামক শব্দটি
শুয়োর, যেমন তোমার স্বাধীনতা।
ওরা সবাই বলে দেশকে ভালোবাসো, কিন্তু দেশ কি? ওরা সবাই
বলে মানুষকে ভালোবাসো, কিন্তু মানুষ কি? ওরা বলে অন্তত নিজেকে
ভালোবাসো, কিন্তু আমি কি? ঈশ্বর-দা, তুমি মরে গিয়ে আমার
ভালোবাসার ঝর্ণাকে রক্ত করে গেছো। তাই বড় ঘৃণা হয়ে তোমার ওপর
তোমার বন্ধুত্বের ওপর। তোমার মৃত্যুকে খুন করতে ইচ্ছে করে।
কিন' আমার কোনো ইচ্ছাইতো পূরণ হয় না।
আমার কোনো ইচ্ছাইতো ইচ্ছা নয়।
আমিতো মেঘের মতো জল্লাদ হতে পারি না।
আমিতো গাছের মত শত্রুতা করতে পারি না।
আমি তো ফুলের মতো লিঙ্গ দেখিয়ে বেড়াতে পারি না।
আমিতো পোকার মত কুট্কুট্ করে কাঠ কাটতে পারিনা।
আমিতো কিছুই পারি না।
আমাকে কেনো রেখে গেলে একা এই দুঃখের সংসারে, কেনো রেখে গেলে
একা - ঈশ্বর-দা, আমিতো যেতে পারতাম তোমার সাথে-সাথে, তোমার
পিছু-পিছু। তুমি একলা চলে গেলে কেনো? আমিতো ছিলাম।
এখন জীবন মানে বাকি থাকলো শুধু
এই চেয়ার ও আমি; এরি নাম অস্তিত্ব; আমি আছি; আমি আছি
আরো কিছুদিন; এরি নাম অস্তিত্ব; অস্তিত্ব মানেই একলক্ষ
ছিয়াশি হাজার টন বোঝা।
এই বোঝা বুকে নিয়ে চেয়ারে বসে আছি আমি মুস্তফা আনোয়ার;
অক্ষম অপদার্থ মনুষত্বহীন অপরাধবোধহীন
একটা বিশ্রীলোক চেয়ারে বসে আছি
একটা পোড়া কালো ল্যাংটো পাথর;
এটা অস্তিত্ব।
এখন আপনারাই বলুন পৃথিবীর হে জ্ঞানী মনুষ্যবৃন্দ, মোটা লোকেরা,
ভালো-লোকেরা, আপনারাই বলুন এ-অস্তিত্বের অর্থ কি। এ-অস্তিত্বের
কি দরকার। এ-অসি-ত্ব বড়ই ঘেন্নার, যেমন বৃষ্টি জল, যেমন
গাছের পাতা, যেমন মেঘের ঢালে চাঁদ। আমাদের মেলা-মেশা,
ভালোবাসা, ঘৃণ্য, ভয়, মনের টান, প্রতিশোধ, খুন জখম ধর্ষণ যেমন
খামাখা। তোমাকে পাওয়া বা না-পাওয়া
তোমার সাথে কাড়হীন শোয়া বা না-শোয়া একই। একই কথা।
যাকগে যাক; পৃথিবীতে উ-আ করে অনেকে বিলাপ করে গেছে;
করছে; করুক। কিছুই যায় আসে না।
আমি বিলাপ করছি না।
বিলাপকে আমার বড় ঘেন্না হয়।
বিলাপ নয়; আমি বলছি; আমি বলছি, আমার আত্মার ঢেউ-এর কথা;
আমার রক্তের কথা; আমার এই কালো হৃদয় থেকে শোঁশোঁ করে
বেরিয়ে-আসা হাওয়ার কথা, জলের কথা।
কাকে বলবো। কেনই-বা বলবো। আর লোকে শুনবেই-বা কেনো;
কার এতো সময় আছে। মানুষের সময় নেই।
কিন্তু অদ্ভুত ঈশ্বর-দা, তোমার সময় ছিলো; তুমি শুনতে, বুঝতে, ভাবতে,
আমার এলোমেলো চুলে তুমি তোমার মমতার হাত রাখতে। আমার
চোখ পর্যন্ত তুমি মই দিয়ে ধাপে-ধাপে এগিয়ে আসতে।
এটাই মনে পড়ছে
এটাই মনে পড়ছে, আর কিছু নয়।
হয়তো আর সবার মত আমিও তোমাকে ভুলে যেতাম। আমারও কোনো
দুঃখবোধ থাকতো না তোমার জন্যে অবশ্যি। আমিও আর সবার
মতন সবাইকে নিয়ে একটা নতুন পৃথিবী গড়ার জন্যে উঠে-পড়ে লেগে
যেতাম, মিস্ত্রীর কাজ শুরু করে দিতাম; সেটা বড় ভালোই হতো
আমার জন্যে। সেটাই হওয়া উচিত ছিলো।
কিন' তুমি যে আমাকে এই নড়বড়ে চেয়ারে বসিয়ে গেছো,
আমি-যে চেয়ার থেকে উঠতে পারি না
আমি-যে অন্য কোনো কাজ করতে পারি না
এক শুধু এই চেয়ারে বসে থাকা ছাড়া
শুধু বসে থাকা ছাড়া।
এ কি-চেয়ার তুমি আমাকে দিলে ঈশ্বর-দা
এ কি-চেয়ার তুমি আমাকে দিলে ঈশ্বর-দা
কেনো দিলে
কেনো দিলে
আমাকে তুমি এক অদ্ভুত স'বিরত্ব দিয়ে কেটে পড়লে,
আর আমার যে - কি দশা হবে, তা একটুও ভাবলে না
আমাকে তুমি এক অদ্ভুত অন্ধকার দিয়ে চলে গেলে
আমি তোমার চেয়ারে বসে-বসে অন্ধকার হয়ে গেলাম।
এখন রাত প্রায় তিনটে বেজে পাঁচ মিনিট হবে, হঠাৎ চারিদিকে হৈচৈ
গণ্ডগোল, মানুষ সব তড়পাচ্ছে, দৌড়াচ্ছে, চেঁচামেচি করছে;
কাকে যেনো ডাকাডাকি করছে; কি হচ্ছে, কি-হচ্ছে, বাইরে চারিদিকে
শুধু গুলির আওয়াজ, মর্টারের শব্দ; কি-হচ্ছে, কি-হচ্ছে, বাইরে
মানুষরা অত চিল্লাচ্ছে কেনো, এতো চিল্লাবিল্লি কিসের; হঠাৎ
চারিদিকে এত হাউকাউ কেন? মানুষ কি চায়? মানুষেরা কি
চায়। কি-চায় তারা?
আমি লাফিয়ে চেয়ার থেকে ওঠার চেষ্টা করলাম; কিন্তু পারলাম না।
চেয়ার আমাকে টেনে রাখলো, যেন আমি আপেল, পাথর, ইট, ইটের
টুকরো বা ঠিকরি। আমি চেয়ারের সাথে আটকে রইলাম, আমি
লাফিয়ে উঠতো পারলাম না; চুপচাপ বসে রইলাম; শুধু গুলি মর্টার
হৈচৈ মানুষের শব্দ; এইসব এইসব এইসব এইসব।
এর মধ্যে সমস্ত কোলাহলকে নিস্তব্ধ করে দিয়ে একটা হৃদয়বিদারক
সাইরেন বেজে উঠলো। একটা শিঙ্গা বেড়ে উঠলো। একটা শব্দ
উত্থিত হলো পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু থেকে।
মানুষেরা প্রত্যেকের হাতে একটা করে পতাকা নিয়ে দৌড়াচ্ছে
প্রেমিক-প্রেমিকা চুমু খাচ্ছে
শিশুরা হাসছে
শিশুরা গড়িয়ে পড়ছে ধাপে-ধাপে সিঁড়ির ওপর দিয়ে নিচের দিকে।
মানুষেরা দৌড়াচ্ছে। আমি কতোগুলো বৈদ্যুতিক প্যাঁচানো
সূক্ষ্ম তার নিরে বসে আছি, কয়েল নিয়ে বসে আছি, হ্যাঁ-নিশ্চই
কিছু শুনবো, নিশ্চই কিছু, শুনবো।
ভোরের দিকে মাইক্রোফোন-এ্যানাউন্সমেন্ট হলো, ঘোষণা হলো,
বাতাসকে বলা হলো
আরে, ভুল শুনেছো
ভুল শুনেছো। তোমরা হেসে ওঠো।
তোমরা বিষাদ ছেড়ে আবার হেসে ওঠো
আমাদের ঈশ্বর দা আসছে
ঈশ্বর-দা মরেনি
ঈশ্বর-দা আবার সবার হাত ধরতে আসছে
ঈশ্বর-দা আবার সবার মাথার কাছে বসতে আসছে
ঈশ্বর-দা নাকি আসছে
ঈশ্বর-দা নাকি আসছে
হ্যাঁ, হতে পারে একটা ক্যূ হয়ে গেছে
ঈশ্বর-দা আসতে পারে।
ঈশ্বর-দা আসতে পারে।
ঈশ্বর-দার মৃত্যুর সংবাদ ভুল ছিলো
ওটা রিউমার ছিলো।
কিন্তু, হায় ঈশ্বর দা’ তোমাকে দেখা আমার হলো না
তোমাকে রিসিভ করতে আমি যেতে পারবো না
আমি এই চেয়ার থেকে আর উঠবো না
আমি এ-চেয়ার থেকে আর উঠবো না
আমি এ-চেয়ার থেকে উঠবো না। তুমি এলেও আমি উঠবো না।
আমি তোমাকে রিসিভ করবো না
আমি তোমাকে শেষ বিদায় জানিয়ে দিয়েছি
এখন তুমি এলেও নেই, না এলেও নেই;
আমি একা থাকবো
আমি তোমার কাছে যাবো না
ঈশ্বর-দা আমি তোমার কাছে যাবো না
আমি একা থাকবো;
তোমাকে দেখার আমার ইচ্ছে হলেও
এতোদিনে আমার একা-থাকা সয়ে গেছে, ভালো লেগে গেছে,
এটাই আমার একমাত্র আনন্দের অস্তিত্ব যে
আমি একা, আর কেউ নেই, আমি একা।
আমি ও চেয়ার, এই থেকে গেলাম।
আমি এই চেয়ার থেকে হোটবো না
তুমি এই শহরে আসো কি না-ই আসো - তুমি আমার ঘরে এসো না।
তোমার জন্যে আমার ঘরের দরজায় একটা বিপুল তালা লাগিয়েছি,
ঈশ্বর-দা-আমাকে হেরে যেতে দাও। আমাকে ধ্বংস হতে দাও।
তুমি আমাকে বাঁচাতে এসো না। আমি দেখতে চাই; এই চেয়ারে বসে আমি
কি করতে পারি আর না-পারি; আমাকে দেখতে দাও; আমাকে ধ্বংস হতে দাও।
তোমার দেওয়া এই চেয়ার ও আমি
এই হোক আমার দেশ।
এই হোক আমার সার্বভৌমত্ব।
এই হোক আমার অস্তিত্ব।
আমার দুঃখ বিষাদ পরাজয় এবং আমার জয়।
তুমি আসবে দেখবে আর জয় করবে, এটা চলবে না।
আমি মানি না। মানবো না।
আমি আসবো, দেখবো ও ধ্বংস হবো, এটা হোক।
আমার ঘরে তোমার আসা মানেই হবে আমার অনন্ত মৃত্যু। তোমার
আদরকে মনে হবে ন্যাকামি। তোমার হাতে এখন তুষার যুগ আবার
ফিরে এসেছে। তোমার পায়ে এখন রক্তের ব্যান্ডেজ বাঁধা। তোমার
চোখে এখন মড়া বেড়ালের ফসফরাস জ্বলছে। তুমিতো এখন আর
আগের মতো থাকতে পারো না। তুমিও বদলে গেছো ঈশ্বর-দা তুমিও
বদলে গেছো নিশ্চই আমারি মতো। এখন তোমার সব কথাই আমার
কাছে ছ্যাবলামি মনে হবে।
কারণ আমি আর আমি নই। আমি আমার অস্তিত্বের শিকড় পেয়ে গেছি।
আমি আর আমি নই।
এখন আমি কাগজ হয়ে গেছি
পেন্সিল হয়ে গেছি
কালি হয়ে গেছি
এখন আমি আউন্স-আউন্স কাগজ হয়ে গেছি
প্রচ্ছদপট হয়ে গেছি
এখন আমি বই হয়ে গেছি।
আমি বদলে গেছি ঈশ্বর-দা
আমি আর আমি নই।
তুমি যে কি চেয়ার দিয়ে গেলে, তোমার চেয়ার আমাকে বদলে দিলো।
আমাকে খারাপ করে দিলো। আমাকে একটা বদলোক করে দিলো।
এইতো, এইমাত্র আবার মাইক্রোফোন-এ্যানাউসমেন্ট হলো
কোন ভেড়ুয়া কবিরাজ তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
সেই ভেড়ুয়া কবিরাজ মানুষের জন্যে অনেক উপকার করেছে
সে অমর হয়ে থাকবে। থাক।
কিন্তু আমার মুশকিলটা হচ্ছে তুমি আমার সামনে এলেই আমাকে চেয়ার
থেকে উঠে দাঁড়াতে হবে; আর আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে চাই না
তোমার সামনে। তোমার দেওয়া চেয়ারে আমি একা বসে থাকতে চাই।
ঈশ্বর-দা, তুমি নাকি আমাদের শহরেও আসবে? হয়তো এসে গেছো
এরি মধ্যে, কেনো-না আকাশ ও সময় এই দুই তোমার হাতে।
তুমি এসো,
ভালো কথা, তুমি এসো
বেশতো ভালো, তোমার শহরে তুমি আসবে, এসো।
এসে আমার চেয়ার কেড়ে নাও
আমার ঘর কেড়ে নাও
আমার একাকীত্ব কেড়ে নাও
আমার বিষাদ ও দুঃখ, জল ও নুন কেড়ে নাও;
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়
আবার বাউণ্ডেলে হয়ে মদ খেতে ছুটে যাই
মাতাল হয়ে ধুলোয় গড়াগড়ি দি।
শুনেছি তুমি আসছো।
ঈশ্বর-দা, তুমি আসছো। এসো
এসে আমাকে ধ্বংস করো।
কেনোই-বা যাওয়ার সময় এই চেয়ার আমাকে দিয়ে গিয়েছিলে, কেনোই-বা
আবার এসে এই চেয়ার কেড়ে নেবে; সেটা আমাদের ব্যক্তিগত
ব্যাপার; সেটা তোমার ও আমার বন্ধুত্বের ব্যাপার; এটা আমাদের
ভালোবাসার ব্যাপার; হ্যাঁ লুপ্ত শুয়োর-ভালোবাসার এটা একটা
ছোট্ট ঘটনা; এ্যাকসিডেন্ট; এটা কিছু-না, কিছু-না।
শহরের রাস্তায়-রাস্তায় জটলা ভিড় চেঁচামেচি, সবাই চেঁচাচ্ছে
ঈশ্বর-দা, আসছে
ঈশ্বর-দা আসছে।
আমিও কয়েকবার চুপিচুপি মনে-মনে আওড়ালাম ঈশ্বর-দা আসছে।
ঈশ্বর-দা আসছে।
আমি অট্টহাসি দিয়ে হা-হা করে হেসে উঠলাম।
আমার টেবিলে রাখা পেন্সিল কাটার ছুরি দিয়ে
আমার দুই চোখ অন্ধ করে দিলাম।
আমার অন্ধ চোখ ঈশ্বর-দা কে
আর কোনোদিন দেখতে পারবে না
দেখবে না
আ, আমি বেঁচে গেলাম।
এসো, আমাদের এই মাছির শহরে
তুমি এসো
বুড়োহাবড়া ঈশ্বর-দা, তুমি এসো।
[কোন ডাকঘর নেই, ১৯৮১]

No comments:
Post a Comment